সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারবাজারের এক অদ্ভুত প্রবণতা হলো ‘মেম স্টক’। কিছু কোম্পানি, যাদের ব্যবসা হয়তো তেমন শক্তিশালী নয়, তাদের শেয়ারের দাম হঠাৎ করেই আকাশ ছুঁয়ে ফেলে, যার মূল কারণ থাকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া উদ্দীপনা ও গুজব। এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তিত হয়েছেন নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ রিচার্ড থেলার। তিনি আচরণগত অর্থনীতির পথিকৃৎ, যিনি দেখিয়েছেন যে মানুষের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত শুধু যুক্তি দিয়ে চলে না, আবেগ ও মনস্তত্ত্বের গভীর প্রভাব থাকে।
২০১৭ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার জেতা থেলারের গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, মানুষ কীভাবে আবেগপ্রবণ হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে। মেম স্টকের উত্থানে তিনি সেই ভুল সিদ্ধান্তের এক নতুন রূপ দেখতে পাচ্ছেন। সাধারণত, একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে বহু মানুষের সম্মিলিত জ্ঞান প্রায়শই সঠিক হয়, যাকে ‘ভিড়ের বুদ্ধিমত্তা’ বলা হয়। কিন্তু থেলার প্রশ্ন তুলছেন, মেম স্টকের ক্ষেত্রে এই ‘ভিড়ের বুদ্ধিমত্তা’ কি আসলেই কাজ করছে, নাকি এটি কেবলই এক সম্মিলিত উন্মাদনা?
মেম স্টকগুলোর দাম বেড়ে যাওয়ার পেছনে কোনো মৌলিক অর্থনৈতিক কারণ থাকে না বললেই চলে। এর চালিকাশক্তি হলো ‘ফোমো’ (হারিয়ে ফেলার ভয়), অর্থাৎ অন্যরা লাভ করছে দেখে নিজেও অংশ নেওয়ার প্রবল আকাঙ্ক্ষা। এই প্রবণতা, গণ-আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া সিদ্ধান্ত এবং অতিমাত্রায় জল্পনা-কল্পনা দ্রুত শেয়ারের দাম বাড়িয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো এই আবেগপ্রবাহকে আরও শক্তিশালী করে তোলে, যেখানে তথ্যের চেয়েও বেশি ছড়ায় গুজব আর হুজুগ।
রিচার্ড থেলার তাঁর আচরণগত অর্থনীতির তত্ত্ব দিয়ে এই ধরনের বাজারের ঝুঁকি তুলে ধরেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, যখন শেয়ারের দাম কোম্পানির প্রকৃত মূল্যকে ছাড়িয়ে যায়, তখন তা একটি বুদবুদের সৃষ্টি করে। এই বুদবুদ যখন ফেটে যায়, তখন বড় ধরনের লোকসানের সম্মুখীন হতে হয় অনেক বিনিয়োগকারীকে, বিশেষ করে যারা শেষের দিকে প্রবেশ করেন। মেম স্টকগুলো চরম অস্থিতিশীল হয় এবং যে কোনো মুহূর্তে এদের পতন হতে পারে, যা দ্রুত লাভ করার আশায় থাকা মানুষগুলোকে বিপদে ফেলে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থেলারের এই সতর্কবার্তা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন যে, শেয়ারবাজারে সফল হতে হলে কেবল জনমত বা হুজুগের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রতিটি বিনিয়োগের পেছনে থাকা উচিত সুচিন্তিত বিশ্লেষণ এবং কোম্পানির প্রকৃত মূল্য সম্পর্কে ধারণা। মেম স্টকের ক্ষণস্থায়ী আকর্ষণ এড়িয়ে বাস্তবসম্মত বিনিয়োগের দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, নতুবা দ্রুত বড় লোকসানের শিকার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এটি কেবল আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি নয়, বরং বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যৌক্তিকতার গুরুত্ব বোঝার এক নতুন সুযোগ।