স্মৃতি হাতড়ে দেখলে এমন অনেক কিছুই চোখের সামনে আসে যা কল্পনাতীত। ২০২২ সালের ২৮শে এপ্রিল স্পোকেনে পল ম্যাককার্টনির কনসার্টে ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত তৈরি হয় যখন তার প্রয়াত সহকর্মী জন লেননকে যেন জীবন্ত রূপে মঞ্চে নিয়ে আসা হয় এআই প্রযুক্তির সাহায্যে। পুরনো অডিও ও ভিডিও থেকে তৈরি হওয়া সেই দৃশ্য দেখে শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন, যেন সময়ের বাধা পেরিয়ে দুজন কিংবদন্তী আবার একসঙ্গে গান গাইছেন। এটি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক অসাধারণ প্রয়োগ যা মানুষের আবেগ ছুঁয়ে গিয়েছিল।
এই ধরনের জেনার্যাটিভ এআই, যা পুরনো তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন কিছু তৈরি করতে পারে, সাম্প্রতিক সময়ে খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এটি কেবল সংগীত বা শিল্পকলায় সীমাবদ্ধ নয়; গভীর নকল (ডিপফেক), বাস্তবসম্মত ছবি তৈরি, এমনকি স্বয়ংক্রিয় লেখালেখির মতো আরও অনেক ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। এই প্রযুক্তি এতটাই আকর্ষণীয় যে এটি সহজেই মানুষের মনোযোগ কেড়ে নেয় এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শেখায়। প্রযুক্তিগত সক্ষমতার দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে এক বিশাল উল্লম্ফন।
তবে, এই জেনার্যাটিভ এআই-এর উজ্জ্বল আলোয় আলোকিত হয়ে আমরা সম্ভবত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীর উদ্ভাবনগুলো থেকে চোখ সরিয়ে নিচ্ছি। এই ধরনের মনোমুগ্ধকর অ্যাপ্লিকেশনগুলো একদিকে যেমন আমাদের মুগ্ধ করে, অন্যদিকে তেমনি এআই-এর আরও বিস্তৃত ও জীবন-পরিবর্তনকারী ক্ষেত্রগুলোকে কিছুটা আড়ালে ফেলে দেয়। এআই কেবল নতুন কিছু তৈরি করতেই নয়, বরং জটিল সমস্যার সমাধান এবং মানবজীবনের উন্নয়নেও নীরবে কাজ করে যাচ্ছে, যা হয়তো ততটা প্রচার পায় না।
উদাহরণস্বরূপ, চিকিৎসা বিজ্ঞানে এআই ড্রাগ আবিষ্কারে সহায়তা করছে, রোগ নির্ণয়কে আরও নির্ভুল করে তুলছে এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার পথ দেখাচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনে ডেটা বিশ্লেষণ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাস দিতে বা শক্তি ব্যবস্থাপনাকে আরও দক্ষ করতেও এআই-এর অবদান অপরিহার্য। এই ধরনের অগ্রগতিগুলো হয়তো জন লেননের মঞ্চে ফিরে আসার মতো সরাসরি আবেগপ্রবণ দৃশ্য তৈরি করে না, কিন্তু মানবজাতির মৌলিক চাহিদা পূরণে এবং টিকে থাকার ক্ষেত্রে এগুলোর প্রভাব অনেক বেশি সুদূরপ্রসারী।
তাই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে শুধু তার জাঁকজমকপূর্ণ দিকটার দিকেই তাকিয়ে থাকলে চলবে না। জেনার্যাটিভ এআই-এর ক্ষমতা অবশ্যই স্বীকার্য, কিন্তু এর পাশাপাশি বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যে নীরবে কাজ চলছে, সেদিকেও আমাদের নজর দেওয়া প্রয়োজন। এআই-এর সত্যিকারের সম্ভাবনা উপলব্ধি করতে হলে এর বহুমুখী ব্যবহার এবং মানবকল্যাণে এর অবদানকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।