গ্রাহকদের প্রতি অটুট আনুগত্যের জন্য পরিচিত জনপ্রিয় বিগ-বক্স চেইন কস্টকো সম্প্রতি একটি নতুন নীতির কারণে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। এই নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ‘এক্সিকিউটিভ টিয়ার’ সদস্যরা, যারা বার্ষিক ১৩০ ডলারের প্রিমিয়াম ফি প্রদান করেন, তারা সাধারণ সদস্যদের (৬৫ ডলার ফি) তুলনায় এক ঘণ্টা আগে দোকানে প্রবেশ করে শান্তিপূর্ণভাবে কেনাকাটার সুযোগ পাবেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি একটি ছোট পরিবর্তন মনে হলেও, এর পেছনে লুকায়িত আছে আধুনিক অর্থনীতির গভীর কিছু প্রবণতা এবং মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এর প্রভাব।
ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে, এই পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে কস্টকোর জন্য লাভজনক। কারণ, মোট গ্রাহকের প্রায় ৪৭ শতাংশ এক্সিকিউটিভ সদস্য হলেও, তারা কস্টকোর মোট আয়ের ৭৩ শতাংশের যোগান দেন। তাই এই উচ্চমূল্যের গ্রাহকদের জন্য বিশেষ সুবিধা তৈরি করে তাদের আনুগত্য আরও দৃঢ় করা এবং অন্যান্য সদস্যদেরও প্রিমিয়াম টিয়ারে উন্নীত হতে উৎসাহিত করা একটি বুদ্ধিমান কৌশল। ফরচুনের মতো ব্যবসায়িক প্রকাশনাও এটিকে ‘বিহেভিওরাল ইকোনমিক্স’-এর একটি স্মার্ট প্রয়োগ হিসেবে দেখছে। আর এই সুবিধা ভোগকারী প্রিমিয়াম সদস্যরা স্বাভাবিকভাবেই উচ্ছ্বসিত, অনেকেই এটিকে ‘শান্তিপূর্ণ ও নিরিবিলি’ কেনাকাটার অভিজ্ঞতা হিসেবে প্রশংসা করছেন।
তবে, এই নীতির অন্য একটি দিকও আছে। যে সকল গ্রাহক অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে ইচ্ছুক বা সক্ষম নন, তাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি তাদের প্রতি এক ধরনের অসম্মানজনক আচরণ। এমনকি একজন ক্ষুব্ধ গ্রাহক তার সদস্যপদ বাতিল করার কথাও জানিয়েছেন, কারণ তিনি মনে করেন কোম্পানি তার সাথে করা চুক্তি লঙ্ঘন করেছে। শুধু গ্রাহকরাই নন, কিছু কস্টকো কর্মীও ভোরবেলা দোকান খোলার এই নতুন নিয়মের কারণে কাজের চাপ বৃদ্ধি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। কস্টকোর সহ-প্রতিষ্ঠাতা জেমস সিনেগালের দর্শনে গ্রাহক সন্তুষ্টি ছিল মূখ্য, কিন্তু এই নতুন নীতি কিছু মানুষের মধ্যে বৈষম্যের অনুভূতি তৈরি করছে।
কস্টকোর এই পদক্ষেপ আসলে আমেরিকান অর্থনীতির একটি বৃহত্তর প্রবণতার প্রতিফলন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং সমাজের শীর্ষ ধনীদের সম্পদ ক্রমশ বাড়ছে। ড্যানিয়েল কারেলের মতো ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা লক্ষ্য করেছেন যে, ডিজনি থিম পার্কের মতো অন্যান্য কোম্পানিগুলোও এখন তাদের সবচেয়ে ধনী গ্রাহকদের জন্য ব্যয়বহুল আপগ্রেড পরিষেবা চালু করছে। উন্নত ডেটা অ্যানালিটিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় কোম্পানিগুলো এখন সহজেই উচ্চ আয়ের গ্রাহকদের চিহ্নিত করতে পারছে এবং তাদের কাছ থেকে আরও বেশি মুনাফা আদায় করার চেষ্টা করছে, যা সমাজের অর্থনৈতিক বিভেদকে আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
যদিও অনেক মূল অর্থনৈতিক সূচক কাগজে-কলমে ইতিবাচক দেখাচ্ছে, তবুও সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নেতিবাচক অনুভূতি কাজ করছে। এই অসন্তোষের একটি বড় কারণ হতে পারে কস্টকোর মতো বিভেদ সৃষ্টিকারী নীতিগুলো। যখন কিছু মানুষ অর্থ খরচের কারণে অন্যদের চেয়ে বেশি সুবিধা পায়, তখন যারা এই সুবিধা পান না, তাদের মনে এক ধরনের বঞ্চনা এবং অসম্মানের অনুভূতি জন্মাতে পারে। সাময়িকভাবে এটি একটি সফল ব্যবসায়িক কৌশল মনে হতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই ধরনের নীতি সমাজে কি ধরনের বিভেদ তৈরি করবে এবং একটি ব্যবসা ও একটি জাতির জন্য এর পরিণতি কি হবে, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
উৎস: https://www.fastcompany.com/91431644/costco-controversial-new-policy-worrying-economy