দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড প্রধান শিক্ষকের পদ। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় ৩২ হাজার শূন্যতা নিয়ে চলছে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাক্রম। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দারের সম্প্রতি দেওয়া তথ্য সেই কঠিন বাস্তবতাই তুলে ধরেছে। এটি কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি হাজার হাজার বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক স্থবিরতা এবং লাখো শিশুর মানসম্মত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়ার এক নীরব প্রতিচ্ছবি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ৩২ হাজার প্রধান শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ করার জন্য যোগ্য সহকারী শিক্ষক রয়েছেন, কিন্তু আইনি জটিলতা বা মামলার কারণে তাদের পদোন্নতি আটকে আছে। পদোন্নতি বঞ্চনা শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে, যা তাদের কাজের স্পৃহায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। একজন নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক যখন দেখেন তার যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর ধরে পদোন্নতি আটকে আছে, তখন তা কেবল তার ব্যক্তিগত স্বপ্নকেই আঘাত করে না, বরং পুরো শিক্ষাব্যবস্থার ওপর আস্থাকেও দুর্বল করে দেয়।
প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের প্রাণকেন্দ্র। তিনিই প্রশাসনিক নেতৃত্ব দেন, শিক্ষকদের অনুপ্রাণিত করেন, শিক্ষার্থীদের একাডেমিক অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং বিদ্যালয়কে একটি সুষ্ঠু পরিবেশে পরিচালিত করেন। ৩২ হাজার বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকা মানে, এই বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ, দৈনন্দিন ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া। অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে হয়তো কাজ চলে যায়, কিন্তু একটি শক্তিশালী ও সুসংহত নেতৃত্ব ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন এক অসম্ভব কাজ।
এই আইনি জটিলতাগুলো রাতারাতি তৈরি হয়নি। সম্ভবত নীতিমালা প্রণয়নে ত্রুটি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব অথবা বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের সংঘাত এসব মামলার জন্ম দিয়েছে। প্রতিটি মামলার পেছনেই রয়েছে এক দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি, যা শেষ পর্যন্ত প্রাথমিক শিক্ষার মতো একটি সংবেদনশীল খাতের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। সরকারের উচিত দ্রুত এসব মামলার নিষ্পত্তি করে পদোন্নতির পথ সুগম করা এবং ভবিষ্যতে যেন এমন পরিস্থিতি তৈরি না হয়, তার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও স্বচ্ছ নীতিমালা প্রণয়ন করা।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে। এই ৩২ হাজার শূন্যপদ পূরণ না হওয়া মানে ৩২ হাজার স্বপ্নের বিদ্যালয় স্থবির হয়ে থাকা। জরুরি ভিত্তিতে এই অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে পদোন্নতির পথ খুলে দেওয়া উচিত। কেবল আইনি লড়াইয়ের নিষ্পত্তি নয়, বরং একটি টেকসই প্রশাসনিক কাঠামো ও সুষম পদোন্নতি নীতি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই আমরা আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারব এবং লাখো শিক্ষার্থীর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পারব।
উৎস: https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/k7fl6w5g2c