নাচ একটি মহৎ শিল্প, যা শরীর ও মনকে প্রকাশের এক অসাধারণ মাধ্যম। ছোটদের নাচ দেখলে মন ভরে ওঠে তাদের সরলতা, আনন্দ আর সাবলীল অঙ্গভঙ্গিতে। একসময় নাচ শেখানো হতো কেবল শিল্পচর্চা আর শৃঙ্খলার জন্য, যেখানে প্রতিটি নড়াচড়া ছিল নিষ্পাপ সৌন্দর্যের প্রতীক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে সেই পবিত্র আঙ্গিকে যেন এক অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রসারের সাথে সাথে শিশুদের নাচও এক নতুন মোড় নিয়েছে, যেখানে শিল্পের চেয়ে “লাইক” আর “ভিউ” বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
এই নতুন ধারার কেন্দ্রে রয়েছে সামাজিক মাধ্যম। মুহূর্তেই যেকোনো ভিডিও বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকায়, অনেক বাবা-মা ও এমনকি প্রশিক্ষকরাও এখন শিশুদের নাচকে এমনভাবে উপস্থাপন করছেন যা তাদের বয়সের সাথে সংগতিপূর্ণ নয়। “ক্লিক” এবং “প্রশংসা” পাওয়ার লোভে এমন পোশাক বা অঙ্গভঙ্গি বেছে নেওয়া হচ্ছে, যা শিশুদের নিষ্পাপ শৈশবকে প্রশ্নের মুখে ফেলে দিচ্ছে। একসময় যেখানে শিশুর স্বাভাবিক অভিব্যক্তিই ছিল প্রধান, সেখানে এখন কৃত্রিম চাকচিক্য ও বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত পরিণত প্রদর্শনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
এর ফলে নাচের মূল উদ্দেশ্যই যেন হারাতে বসেছে। নাচ কেবল দেহের নড়াচড়া নয়, এটি আত্মপ্রকাশের একটি গভীর মাধ্যম, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের একটি প্রক্রিয়া। কিন্তু যখন এটি কেবলই প্রদর্শনীতে পরিণত হয়, তখন শিশুরা এর শৈল্পিক গভীরতা উপলব্ধি করতে পারে না। তাদের মনে নাচের প্রতি ভালোবাসা জন্মায় না, বরং তৈরি হয় কেবল অন্যদের চোখে ভালো লাগার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা। শিল্পের আসল মূল্যবোধ, যেমন কঠোর পরিশ্রম, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিগত অভিব্যক্তি, ক্রমশ গৌণ হয়ে পড়ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের সকলেরই সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাবা-মা, নৃত্য প্রশিক্ষক এবং দর্শকের – প্রত্যেকেরই দায়িত্ব রয়েছে শিশুদের শৈশবকে রক্ষা করার। শিশুদের নাচ যেন তাদের নিজস্ব আনন্দ, শারীরিক সক্ষমতা এবং সৃজনশীলতাকে ফুটিয়ে তোলার মাধ্যম হয়, কোনো অসুস্থ প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র না হয়। সামাজিক মাধ্যমে কী ধরনের বিষয়বস্তু প্রচার করা হচ্ছে এবং শিশুদের উপর এর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে আমাদের আরও বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
আসুন, শিশুদের নাচের জগতকে আবার তার পুরনো গৌরব ও সরলতায় ফিরিয়ে আনি। তাদের নাচ হোক স্বতঃস্ফূর্ত, নির্দোষ এবং শুধুমাত্র তাদের নিজেদের আনন্দের জন্য। “লাইক” বা “ভিউ”-এর মরীচিকার পেছনে না ছুটে, আমরা তাদের সত্যিকারের শৈল্পিক বিকাশে সহায়তা করি। শিশুদের শরীর ও মন যেন শৈশবের স্বাভাবিক ছন্দে বেড়ে ওঠে, কোনো ধরনের বাণিজ্যিক বা অনুপযুক্ত প্রভাবমুক্ত হয়ে। এই লক্ষ্যেই আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
উৎস: https://www.latimes.com/opinion/story/2025-10-28/childrens-dance-sexualization