প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় যখন ডেঙ্গুর নতুন নতুন পরিসংখ্যান ভেসে আসে, তখন বুকটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে। গত ২৪ ঘণ্টার তথ্য আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে ডেঙ্গু কতটা নীরব ঘাতক হতে পারে। ৬১৫ জন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং তিনজনের মূল্যবান জীবন কেড়ে নিয়েছে এই রোগ – এই সংখ্যাগুলো কেবলই পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি সংখ্যার পেছনে লুকিয়ে আছে এক একটি পরিবারের উদ্বেগ, কষ্ট আর হারানোর বেদনা।
একটা সময় ছিল যখন ডেঙ্গুকে আমরা কেবল বর্ষাকালের রোগ ভাবতাম। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর চিত্র অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন প্রায় সারা বছরই এর প্রকোপ দেখা যায়, বিশেষ করে আবহাওয়া পরিবর্তনের এই সময়ে ডেঙ্গুর মশার প্রজনন আরও বেড়ে যায়। শহরাঞ্চলে অসচেতনভাবে ফেলে রাখা আবর্জনা, টবের জমা পানি কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের জলাশয়গুলো পরিণত হয় মশার নিরাপদ আশ্রয়স্থলে, যা পরবর্তীতে মহামারীর রূপ নিতে পারে।
৬০০-এর বেশি রোগীর প্রতিদিন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া মানে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি হওয়া। চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতালের কর্মীদের ওপর যে অতিরিক্ত কাজের বোঝা চাপে, তা আমাদের অনুধাবনের বাইরে। শুধু তাই নয়, একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা খরচ, কর্মস্থলে অনুপস্থিতি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যে যে মানসিক উদ্বেগ সৃষ্টি হয়, তা সামগ্রিকভাবে সমাজের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
এই পরিস্থিতিতে প্রতিরোধের উপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। আমাদের চারপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, ফুলের টব, বাতিল টায়ার বা যেকোনো পাত্রে পানি জমে থাকতে না দেওয়া – এই ছোট ছোট কাজগুলোই ডেঙ্গু মশা নির্মূলে অনেক বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে মশারি ব্যবহার করা, মশা তাড়ানোর স্প্রে ব্যবহার করা এবং জ্বর হলেই দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া অত্যন্ত জরুরি। শুধুমাত্র সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না, প্রতিটি নাগরিকের সচেতন অংশগ্রহণ অপরিহার্য।
ডেঙ্গুর এই ভয়াবহতা থেকে মুক্তি পেতে হলে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যক্তিগত ও সামাজিক সচেতনতার বিপুল বিস্তার। প্রতিটি পাড়া, মহল্লা এবং বাড়ির আঙিনাকে মশার প্রজননমুক্ত রাখতে পারলেই আমরা হয়তো এই অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে জয়ী হতে পারব। আসুন, আজকের এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান থেকে শিক্ষা নিয়ে একটি সুস্থ ও ডেঙ্গুমুক্ত আগামী গড়ার অঙ্গীকার করি।