স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে সারাদেশে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৬৭ জন, আর এই সময়ের মধ্যে আমরা হারিয়েছি ৭টি মূল্যবান প্রাণ। এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যার হিসাব নয়, এটি অসংখ্য পরিবারের ওপর নেমে আসা এক গভীর শোকের প্রতিচ্ছবি। আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ডেঙ্গু এক নিত্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা মৌসুমী রোগের গণ্ডি পেরিয়ে বছরজুড়েই তার ভয়াবহতা দেখাচ্ছে।
এই বিপুল সংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি এবং প্রাণহানির ঘটনা আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে যে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি এখনো কতটা উদ্বেগজনক। বর্ষার শেষেও এডিস মশার উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে মশার প্রজনন অনুকূল পরিবেশ পাওয়া – এসবই ডেঙ্গুর বাড়বাড়ন্তের প্রধান কারণ। নাগরিক সচেতনতার অভাব এবং কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতাও এর পেছনে দায়ী।
প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে থাকে একটি পরিবার, যারা প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫৬৭ জন মানুষও জীবনের সঙ্গে লড়ছেন, যা আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর এক বিরাট চাপ সৃষ্টি করছে। শুধুমাত্র শারীরিক যন্ত্রণা নয়, এই রোগ অর্থনৈতিকভাবেও একটি পরিবারকে পঙ্গু করে দিতে পারে। বিশেষ করে, নভেম্বরের শেষ দিকেও যখন ডেঙ্গুর এমন ভয়াবহতা দেখা যায়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে পরিস্থিতি কতটা জটিল এবং এর একটি দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের প্রয়োজন কতটা জরুরি।
এই ভয়াল থাবা থেকে মুক্তি পেতে সম্মিলিত প্রচেষ্টার বিকল্প নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির আশেপাশে এবং কর্মস্থলের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, পানি জমতে দেওয়া যাবে না। স্থানীয় সরকার এবং স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও কার্যকরভাবে মশা নিধন কার্যক্রম চালাতে হবে এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে জোর দিতে হবে। ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং পরীক্ষা করিয়ে সঠিক চিকিৎসা শুরু করা অপরিহার্য।
ডেঙ্গু এখন আর শুধুমাত্র একটি রোগের নাম নয়, এটি আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার একটি কঠিন পরীক্ষা। ৭টি মৃত্যু এবং ৫৬৭টি নতুন সংক্রমণ আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, আত্মসন্তুষ্টির কোনো অবকাশ নেই। যদি আমরা সকলে সচেতন হই, নিজেদের দায়িত্ব পালন করি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকে গুরুত্ব দেই, তবেই হয়তো এই নীরব ঘাতককে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে। একটি সুস্থ ও ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণে সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ আজ সময়ের দাবি।