আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ নার্স ও মিডওয়াইফরা। রোগীদের সেবা, সান্ত্বনা এবং সুস্থ করে তোলার পেছনে তাঁদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই নিরলস সেবাদাতারা যখন কর্মবিরতিতে যান, তা কেবল একটি কর্মসূচির চেয়েও বেশি কিছু ইঙ্গিত করে। সম্প্রতি, পেশাগত সংস্কার ও দীর্ঘদিনের বৈষম্য দূর করার দাবিতে দেশজুড়ে একটি প্রতীকী শাটডাউন পালিত হয়েছে। এই স্বল্পকালীন নীরবতা আসলে আমাদের পুরো স্বাস্থ্যখাতকে এক গভীর বার্তা দিয়েছে, যা কেবল তাদের দাবি নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে।
গত রবিবার, নির্দিষ্ট দুই ঘণ্টার জন্য দেশের সরকারি-বেসরকারি সকল স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশ নার্সেস অ্যাসোসিয়েশন (বিএনএ) এবং বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটি (বিএমএস)-এর আহ্বানে এই বিশেষ কর্মসূচি পালিত হয়। সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই সময়টুকুতে তারা তাদের দাবীগুলো তুলে ধরেছেন, যা রোগীদের জরুরি সেবা ব্যাহত না করে একটি শক্তিশালী প্রতিবাদ প্রদর্শনের পথ। এই প্রতীকী পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে, তাদের অসন্তোষ অনেক গভীরে প্রোথিত এবং তা সমাধানের জন্য জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন।
এই প্রতিবাদের মূল কারণ পেশাগত সংস্কারের অভাব এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বৈষম্য। নার্সিং ও মিডওয়াইফারি সেক্টরে কর্মরতরা প্রায়শই তাঁদের যোগ্যতা ও পরিশ্রমের তুলনায় কম স্বীকৃতি পান। বেতন কাঠামো, পদোন্নতির সুযোগ, এবং কর্মপরিবেশ নিয়ে তাদের মধ্যে অসন্তোষ বিদ্যমান। কোভিড-১৯ মহামারীর সময় তাঁদের আত্মত্যাগ আমাদের সকলেরই মনে আছে, যখন তাঁরা নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিলেন। অথচ সেই আত্মত্যাগের পরও তাদের পেশাগত মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি আসেনি, যা তাদের মধ্যে হতাশার জন্ম দিয়েছে।
দুই ঘণ্টার এই প্রতীকী শাটডাউন কেবল নার্স ও মিডওয়াইফদের নিজস্ব দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি সমগ্র স্বাস্থ্যখাতের দুর্বলতাগুলোকেও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। যখন স্বাস্থ্যসেবার ফ্রন্টলাইন কর্মীরাই অসন্তুষ্ট থাকেন, তখন তা সামগ্রিক সেবার মানকেও প্রভাবিত করতে পারে। এই ধরনের প্রতিবাদ সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি স্পষ্ট সংকেত যে, স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করতে হলে এই সেবাদাতাদের পেশাগত উন্নতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। এটি কেবল তাদের অধিকার নয়, দেশের সকল নাগরিকের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার পূর্বশর্তও বটে।
তাই, এই প্রতীকী কর্মবিরতিকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, বরং এটিকে স্বাস্থ্যসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার প্রতিধ্বনি হিসেবে দেখা উচিত। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে নার্স ও মিডওয়াইফদের যৌক্তিক দাবিগুলো পর্যালোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তাঁদের পেশাগত মান উন্নয়ন, ন্যায্য বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করা গেলেই কেবল একটি টেকসই ও শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। কারণ, তাঁদের সুস্থ মন ও সন্তুষ্ট কর্মজীবনই আমাদের সুস্থ সমাজের ভিত্তি।